আর্জেন্টিনা বাঙালির আবেগ। ব্রাজিলও তাই। এক দল যদি বলে পেলে-গারিঞ্চা-নেইমারের কথা। অন্য দল টেনে আনবে ম্যারাডোনা-মেসিকে।
ফুটবলে বাঙালির চালচুলো না থাকতে পারে, আবেগ আছে ষোলোআনা। কোপা আমেরিকায় আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল ফাইনাল ঘিরে সেই আবেগে ঢেউ লেগেছে। না, ঢেউ নয় এটাকে সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস বলাই ভালো! তাই বাংলাদেশ থেকে প্রায় দেড় হাজার মাইল দূরের রিও’র মারাকানায় রাত পোহালে (বাংলাদেশ সময় কাল সকাল ৬টায় শুরু ফাইনাল) কী হবে তা নিয়ে উদগ্রীব আমি, আপনি সবাই! উদগ্রীব বাংলাদেশের মতো গোটা দুনিয়াও।
কে জিতবে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের শতাব্দী প্রাচীন লড়াইয়ে এই প্রশ্নটাই অবান্তর। যদিও নেইমার বলেছেন, ‘মেসি আমার দেখা সেরা ফুটবলার। পরম বন্ধুও। কিন্তু এই ফাইনালে আমরা প্রতিপক্ষ। নিজের এবং দেশের হয়ে প্রথমবারের জন্য ট্রফিটা আমি জিততে চাই। ’ নেইমার পারবেন কিনা তা সময়ই বলবে।
অন্যদিকে মেসি। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর সঙ্গে তার তুলনা হয়। নেইমারের সঙ্গেও। কিন্তু দুনিয়া জানে তার সামনে একজনই আছেন ডিয়েগো ম্যারাডোনা। বিশ্বকাপ যার ভল্টে। নাপোলিকে একা অমরত্ব দিয়ে গেছেন। শুধু বার্সেলোনার হয়ে অমর কীর্তিগাঁথায় সেই ঈশ্বরকে ছোঁয়া দূর, আলোচনাতেই আসা যাবে না। তাই বিশ্বকাপ না হোক মেসির একটা কোপা অন্তত চাই। এবার সেই সুযোগ। বয়স ৩৪। আন্তর্জাতিক ফুটবলারের জন্য এটা গত-যৌবন। তাই যা করার আজই করতে হবে। আশার কথা তুখোড় ফর্মে আছেন তিনি। চলতি কোপায় ১১ গোল করেছে আর্জেন্টিনা। প্রতিটাতেই মেসি আছেন। চারটা করেছেন নিজে। পাঁচটাতে সরাসরি পাস দিয়েছেন। অন্য দুটিতে অ্যাসিস্ট করেছেন যথাসাধ্য। কাল ভোরে মারাকানায় কী করবেন? লাখ টাকার প্রশ্ন। তবে আর্জেন্টিনার সব আক্রমণের উৎস যে তিনিই হবেন তা নিয়ে কোনো সন্দেই নেই! কলম্বিয়ার বিপক্ষে টাইব্রেকারে সেমির বাধা পেরুনোর পর তিন শট ঠেকানো এমিলিয়ানো মার্তিনেজকে যেভাবে জড়িয়ে ধরেছিলেন, সেই ছবিতেই স্পষ্ট ফাইনালে উঠতে পারাটা কতটা আরাধ্য ছিল মেসির জন্য। শিরোপাবুভুক্ষু মেসি বলেছেন, ‘ফাইনালে উঠেই রোমাঞ্চিত আমরা। অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে শিরোপা জয়ের জন্য বেশি উন্মুখ। ’
ম্যারাডোনা যখন খেলতেন তখন ফুটবল মাঠে তার ঐশ্বরিক দক্ষতাময় স্টাইলের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘ডিওগিজম’। এটা কী জিনিস ছিয়াশি দেখেছে। নাপোলিও জানে। মিশেল প্লাতিনি এতটাই মুগ্ধ ছিলেন সেই ম্যারাডোনা স্টাইলে যে একবার ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেই ফেলেন, ‘জিদান যা বল নিয়ে করে দেখাতে পারবে, ম্যারাডোনা সেটা করে দেখাতে পারত কমলালেবু নিয়ে। ’ তো মেসিও কিন্তু ডিয়েগোর মতো একা ম্যাচের রঙ বদলে দেওয়ার ম্যাজিক জানেন। গোলমুখে একটা ফ্রি-কিক দিয়ে দেখুন। কিংবা পাস। প্রতিপক্ষের ডি-বক্সে ম্যারাডোনার মতোই তিনি ‘শিল্পের বিস্ফোরণ’ হয়ে উঠবেন। পাস খেলতে খেলতে ফুলের কমনীয়তায় ডিফেন্স চিরে দেবেন। মেসির হঠাৎ ক্ষিপ্রতাও ভয়ংকর। প-িতরা এই প্যাকেজের নাম দিয়েছেন ‘মেসিজম’। মুহূর্তে যা ম্যাচের রঙ বদলে দেয়। মারাকানায় ব্রাজিল তেমন কিছুর মুখে পড়লে রোজারিওতে খুশির বন্যা বইবে। তার ঢেউ লাগবে বাংলাদেশেও।
কোপার রেকর্ড অবশ্য ব্রাজিলের পক্ষে। ২০১৯ সালের সেমিফাইনালেও তারা আর্জেন্টিনাকে হারিয়েছিল। সেই ম্যাচে নেইমারও ছিলেন না চোটের কারণে। এবার খেলবেন তো বটেই, সঙ্গে আছে ব্রাজিলের দুর্ধর্ষ ডিফেন্স। বিশ্বকাপ বাছাই এবং কোপা মিলিয়ে তিতের দল ১২ ম্যাচে মাত্র ৪ গোল হজম করেছে। রাইট ব্যাকে দানিলো দারুণ খেলছেন। বাম দিকে রেনান লোদিও দারুণ। সেন্টার ব্যাকে মার্কিনহোস অনবদ্য। সঙ্গে থিয়াগো সিলভা, একটু গতি কমলেও এখনো দুর্ধর্ষ। তুলনায় আর্জেন্টিনার ডিফেন্স একটু পিছিয়ে আছে। ইনজুরির কারণে গত তিন ম্যাচে না খেলা ক্রিস্টিয়ান রোমেরো কি খেলবেন? পেসিলা ও নিকোলাস ওতামেন্দি কি ঠেকাতে পারবেন নেইমারদের সাম্বা নাচ। কাসিমিরো, ফ্রেড, লুকাস পাকুয়েতা, ফিরমিনো, গ্যাব্রিয়েল বারবোসা এবং অবশ্যই নেইমার এদের থামানো কিন্তু সহজ নয়। পেরুর সঙ্গে লাল কার্ড পাওয়ায় ফাইনাল খেলতে পারবেন না গ্যাব্রিয়েল জেসুস।
মেসির সঙ্গেও আক্রমণের সৈন্য-সামন্ত কম নেই। স্কালোনি ৪-৪-২ ছকে খেলালে মাঝমাঠে রদ্রিগো ডি পল এবং জিওভান্নির মাঝে খেলতে পারেন লিওনার্দো পারেদেস। সঙ্গে রদ্রিগুয়েজ এবং নিকোলাস গঞ্জালেস। চলতি কোপায় আর্জেন্টিনার মাঝমাঠই সবচেয়ে ঝলমলে। গোল করার জন্য আছেন মার্তিনেজ, আলেসান্দ্রো গোমেজ এবং অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়া এবং অবশ্য লিওনেল মেসি।
এত কিছু লেখার দরকার ছিল না। আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের ফাইনাল প্রতিদ্বন্দ্বিতার গুরুত্ব বোঝাতে মেসি-নেইমার নাম দুটিই যথেষ্ট। ভুবনব্যাপী করোনা অতিমারীর তা-বে এরাই পারেন মৃত্যুভয়কে অল্প সময়ের জন্য হলেও ভুলিয়ে রাখতে। মারাকানায় মেরে কেটে পাঁচ হাজার দর্শক থাকবে। কিন্তু বিশ্বব্যাপী এ ম্যাচের দর্শক সংখ্যা অগণন। লাতিন অমেরিকার ফুটবল উৎকর্ষের সমঝদার কে নয়! কাল ভোরে সেই উৎকর্ষের শ্রেষ্ঠত্ব লাভের লড়াই। বহু মৃত্যুশোকে ভারাতুর পৃথিবী সেই লড়াই দেখার অপেক্ষায়!
You must be logged in to post a comment.