1. meghnaonline24@gmail.com : দৈনিক মেঘনা :
শুক্রবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৫, ০৬:১৯ অপরাহ্ন

বিস্তারিত জানতে এসএমএস/ফোন করুন 👇

আখেরি মোনাজাতে বিশ^ ইজতেমার প্রথম পর্ব সমাপ্ত, আমিন ধ্বনিতে প্রকম্পিত তুরাগ তীর

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • Update Time : রবিবার, ২ ফেব্রুয়ারী, ২০২৫
  • ৪৯ ০০০

বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, মুক্তি, সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধি, নিরাপত্তা, ইহ ও পারলৌকিক কল্যাণ কামনা করে, অশ্রæসিক্ত আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হলো পবিত্র হজের পর মুসলিম জাহানের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় সমাবেশ তাবলিগ জামাতের বিশ্ব ইজতেমার শুরায়ী নেজামের তত্ত্বাবধানে ৫৮তম বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্বের প্রথম ধাপ।
ইজতেমা ময়দানের বিদেশি নিবাসের পূর্ব পাশের মঞ্চ থেকে এসব লাখো মানুষের কাঙ্ক্ষিত আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করেন বিশ্ব তাবলীগ জামায়াতের বিশিষ্ট বুজুর্গ আলেমে দ্বীন হাফেজ মাওলানা মোহাম্মদ জুবায়ের আহমেদ।
গতকাল রবিবার সকাল ৯টা ১১ মিনিট থেকে শুরু করে ৯টা ৩৫ মিনিট পর্যন্ত প্রথমে ১২ মিনিট আরবিতে ও পরে বাংলায় ১২ মিনিটসহ ২৪ মিনিট স্থায়ী আবেগঘন আখেরি মোনাজাতে গভীর ভাবাবেগপূর্ণ পরিবেশে ‘আমীন, আলাহুম্মামীন’ ধ্বনিতে প্রকম্পিত হয় টঙ্গীর আকাশ-বাতাস।রাজধানী ঢাকাসহ সমগ্র বাংলাদেশের প্রায় কয়েক লক্ষাধিক মুসল্লি ছাড়াও আখেরি মোনাজাতে অংশ নিয়েছেন বিশ্বের অর্ধশতাধিক বিদেশি রাষ্ট্রের প্রায় ২ সহস্রাধিক ধর্মপ্রাণ মুসলমান।
মোনাজাতে অযুত কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে রাহমানুর রাহীম আলাহর মহত্ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব। সবাই যেন কিছু সময়ের জন্য আল্লাহর প্রেমে দিওয়ানা হয়ে ভুলে গিয়েছিল হিংসা-বিদ্বেষ ও ভেদাভেদ। আমীর-ফকির, মনীব-ভৃত্য, ধনী-গরিব, নেতাকর্মী নির্বিশেষে সব শ্রেণি-পেশা ও গোষ্ঠীর মানুষ পরওয়ারদেগার আল্লাহর দরবারে দু’হাত তুলে নিজ নিজ কৃতকর্মের জন্য নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন।
বিশাল জনসমুদ্র থেকে মধ্য সকালের আকাশ কাপিয়ে ধ্বনি উঠে-‘ইয়া আল্লাহ, ইয়া আল্লাহ’। আখেরি মোনাজাতের সময় মুঠোফোন, বেতার, ওয়ারলেস সেট, ইলেকট্রনিক্স মিডিয়া এবং স্যাটেলাইট টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারের সুবাদে দেশ-বিদেশের আরো লাখ লাখ মানুষ এক সঙ্গে হাত তুলেছেন ক্ষমাশীল পরওয়ারদিগারের শাহী দরবারে। গুনাহগার, পাপী-তাপী বান্দা প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা চেয়ে কান্নায় চোখের পানিতে বুক ভাসিয়েছেন।
সকাল থেকে দিক নির্দেশনামূলক বয়ান করছেন ভারতের মাওলানা আব্দুর রহমান। তার বয়ান বাংলায় তরজমা করছেন বাংলাদেশের মাওলানা আব্দুল মতিন।
এই বয়ানের পরেই ভারতের মাওলানা ইব্রাহিম দেওলা নসিহতমূলক বয়ান কনে। তার বয়ান তরজমা করেন শুরায়ী নেজামের শীর্ষ মুরুব্বী বাংলাদেশের মাওলানা জুবায়ের । এর পর লাখো মানুষের প্রতীক্ষার অবসান ঘটে বেলা ৯টা ১০ মিনিটে।
জনসমুদ্রে হঠাৎ নেমে আসে আবেগঘন পিনপতন নীরবতা। যে যেখানে ছিলেন সেখানে দাঁড়িয়ে কিংবা বসে হাত তুলেন আল্লাহর দরবারে। আখেরি মোনাজাতকে ঘিরে লাখ লাখ মুসলমান যেন ভেঙে পড়েছিলেন টঙ্গীতে। রাজধানী ঢাকা ছিল প্রায় ফাঁকা। টঙ্গী, গাজীপুর, উত্তরাসহ চারপাশের এলাকার প্রায় সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কলকারখানা, মার্কেট, বিপনীবিতান, অফিসসহ সব কিছু ছিল বন্ধ।
আখেরি মোনাজাতে শরিক হতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা টঙ্গী অভিমুখে ছুটতে থাকেন শুক্রবার থেকেই। বিশ্ব ইজতেমায় অংশগ্রহণকারীরা ছাড়াও কেবলমাত্র আখেরি মোনাজাতে শরিক হতে দূর-দূরান্ত থেকে মুসল্লিরা বাস, ট্রাক, পিকআপ, মিনিবাস, কার, মাইক্রোবাস, ট্রেন, লঞ্চ-স্টিমারে করে টঙ্গীতে পৌঁছে অবস্থান নিতে শুরু করেন। রাজধানীসহ পার্শ্ববর্তী এলাকার লোকজন ভিড় এড়াতে নানা ঝক্কি-ঝামেলা উপেক্ষা করে রাতেই টঙ্গীমুখী হন।
রাজধানী ঢাকা, গাজীপুর ও টঙ্গীর সরকারি বেসরকারি অফিস, ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান, দোকানপাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সর্বত্রই ছিল পূর্ণ ছুটির আমেজ। গভীর রাত থেকে টঙ্গীমুখী সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়ায় দীর্ঘ পথ হেঁটে টঙ্গী পৌঁছতে হয়েছে লাখ লাখ মানুষকে।
কয়েক লাখ মানুষ রাতেই ইজতেমার মাঠ কিংবা আশপাশের বাসা-বাড়ি, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের উড়াল সড়ক, বিভিন্ন ভবন, ভবনের ছাদ কিংবা করিডোরে এমনকি গাছতলায় অবস্থান নেন।
রবিবার ভোররাত থেকে যানবাহন শূন্য সড়ক-মহাসড়ক ও নদীপথে টুপি-পাঞ্জাবি পরা মানুষের বাঁধভাঙা জোয়ার শুরু হয়। চারিদিকে যতদূর চোখ যায় শুধু মানুষ আর মানুষ। সকাল ৭টার মধ্যে গোটা এলাকা জনতার মহাসমুদ্রে পরিণত হয়।
নারীদের অংশগ্রহন:
বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্বে পুরুষ মুসল্লিদের পাশাপাশি নারীদের অংশগ্রহণও আগের তুলনায় বেড়েছে। মোনাজাতে শরীক হতে সকাল থেকে ময়দানের চারপাশে বিভিন্ন অলি-গলির খালি জায়গায় বসে হাজার হাজার মহিলা আখেরি মোনাজাতে শামিল হন।
টঙ্গীর ইজতেমা ময়দানের চারপাশে মিলগেট, কলেজগেট, স্টেশন রোড, টঙ্গী বাজার, কামারপাড়া, আব্দুল্লাহপুরসহ ময়দানের চারদিকে রাস্তার পাশে ও ফুটপাতে নারীরা বসে মোনাজাতে শরিক হন।মহিলাদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা না থাকায় আগত মহিলাদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
ড্রোন মাটিতে পড়ার শব্দে আতঙ্ক:
আখেরি মোনাজাত চলাকালে হঠাৎ মুসল্লিরা আতঙ্কে ছোটাছুটি শুরু করেন। ড্রোন মাটিতে পড়ার শব্দ থেকে এই আতঙ্ক বলে জানা গেছে। এতে শতাধিক মুসল্লি আহত হয়েছেন।এর মধ্যে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ৪০ জন।
আখেরি মোনাজাত চলাকালে সকাল ৯টা ৩১ মিনিটে টঙ্গী স্টেশন রোডে ফ্লাইওভারের পূর্ব পাশে টঙ্গী-কালিগঞ্জ আঞ্চলিক সড়কে এ ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শী গাজীপুর জেলার কালিগঞ্জের বাহাদুর সাদী ইউনিয়নের জুগলি গ্রামের লোকমান মিয়ার ছেলে আমজাদ হোসেন বলেন, আমার সামনে হঠাৎ তিনটি ড্রোন পড়ে গিয়ে বাঁশের সঙ্গে লেগে শব্দ হয়। এতে আতঙ্ক দেখা দিলে দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়।
টঙ্গী আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালে কর্তব্যরত সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) বেলায়েত হোসেন বলেন, ড্রোন পড়ার আতঙ্কে অনেক মুসল্লি দৌড়ে হাসপাতালে আসেন।
আহতদের মধ্যে টঙ্গী আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন আবুল কালাম (৫৫), আলামিন (৩২), আজাদ (৩০), ওবায়দুল্লাহ (৩২), রাতুল (১৮), আব্দুল করিম (২৮) সাইফুল ইসলাম (৩৮), জাফর উদ্দিন (৩১) জয়নাল (২৪), মকবুল হোসেন (৬৪) সোহাগ (৬০), মোশারফ (৩০)সহ শতাধিক ব্যক্তি।
টঙ্গী আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ইনচার্জ মোস্তাফিজুর রহমান জানান, শতাধিক মুসল্লি আহত হয়ে হাসপাতালে এসেছেন। তাদের চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।তারা ইজতেমার মোনাজাত চলাকালে আতঙ্কে হুড়োহুড়ি করার সময় পড়ে গিয়ে আহত হয়েছেন।
টঙ্গী পূর্ব থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ফরিদুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে ব্যাটারি শেষ হয়ে যাওয়ায় একটি ড্রোন পড়ে যায়। এর শব্দ থেকে আতঙ্কের সৃষ্টি। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ জিএমপির অপরাধ দক্ষিণ বিভাগের উপকমিশনার এন এম নাসিরুদ্দিন বলেন, কামারপাড়া সড়কে ব্যাটারি শেষ হয়ে যাওয়ায় একটি সক্রিয় ড্রোন মাটিতে পড়ে যায়।

মোনাজাত শেষে ঘরে ফেরা মানুষের ভোগান্তি:
আখেরি মোনাজাত শেষ হওয়ার পর একসঙ্গে লাখ লাখ মানুষ ফিরতে শুরু করলে সর্বত্র মহাজটের সৃষ্টি হয়।টঙ্গী স্টেশনে ফিরতি যাত্রীদের জন্য অপেক্ষমাণ ট্রেনগুলোতে উঠতে মানুষের জীবনবাজির লড়াই ছিল উদ্বেগজনক। ট্রেনের ভেতরে জায়গা না পেয়ে ছাদে ও দরজা-জানালায় ঝুলে হাজার হাজার মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ফিরতে দেখা যায়। একপর্যায়ে মানুষের জন্য ট্রেন দেখা যাচ্ছিল না। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ও আশুলিয়া সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় ফিরতি মুসল্লিদের বিড়ম্বনা ও কষ্টের সীমা ছিল না।হাজার হাজার বৃদ্ধ, শিশু-কিশোর ও নারী মাইলের পর মাইল হেঁটে মোনাজাতে শরিক হন এবং একইভাবে ফিরতে শুরু করেন। মোনাজাতের পর সীমিত আকারে যানবাহন চলাচল শুরু হলেও পরিস্থিতির তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। তবে অধিকাংশ যানবাহন যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছে বলে অভিযোগ করেছেন একাধিক মুসল্লি।
মৃত্যু: বিশ্ব ইজতেমার মিডিয়া সমন্বয়কারী হাব্বিবুল্লাহ রায়হান জানান, আব্দুল গফুর বার্ধক্যে কারণে অসুস্থ ছিলেন। ইজতেমা ময়দানে অবস্থান করার সময় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।এ নিয়ে বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্বে এখন পর্যন্ত পাঁচজন মুসল্লির মৃত্যু হয়েছে। এর আগে আরও চার মুসল্লি বিভিন্ন শারীরিক অসুস্থতার কারণে মারা যান। তাদের মধ্যে বেশির ভাগই ছিলেন বয়স্ক।
প্রসঙ্গত, তিন ধাপে অনুষ্ঠিত হচ্ছে এবারের ৫৮তম বিশ্ব ইজতেমা। শুরায়ী নেজামের অধীনে আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হবে বিশ্ব-ইজতেমার প্রথম পর্বের প্রথম ধাপ। এরপর আগামীকাল দ্বিতীয় ধাপ শুরু হয়ে ৫ ফেব্রæয়ারি আখেরি মোনাজাতে শেষ হবে। এরপর ৮ দিন বিরতি দিয়ে ১৪ ফেব্রæয়ারি দ্বিতীয় পর্ব বিশ্ব ইজতেমার আয়োজন করবেন সাদ অনুসারীরা।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

বিস্তারিত জানতে এসএমএস/ফোন করুন 👇

বিস্তারিত জানতে ছবিতে 👇 ক্লিক করে–ফেসবুকে এসএমএস করুন 👇

© All rights reserved © 2021
Theme Customized BY IT Rony