ক্যানসার চিকিৎসায় ইনজেকশন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক / ৩২ ooo
Update : সোমবার, ১ জুন, ২০২৬

ক্যানসারবিরোধী নতুন এক ইনজেকশনের পরীক্ষা চালিয়েছেন চিকিৎসকরা, যা রোগীর শরীরে থাকা সম্পূর্ণ টিউমার নির্মূল করে দিতে পারে। চিকিৎসকরা এই ফলাফলকে ‘অভূতপূর্ব’ এবং গবেষকরা একে ‘নজিরবিহীন’ বলে অভিহিত করেছেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বের ১১টি দেশে আন্তর্জাতিক ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় (ট্রায়াল) এমন রোগীর শরীরে এই ইনজেকশন দেওয়া হয়, যাদের ক্যানসার ছড়িয়ে পড়েছে বা পুনরায় ফিরে এসেছে এবং অন্যান্য চিকিৎসায় যাদের কোনো সুফল পাওয়া যায়নি। ফলাফলে দেখা গেছে, ‘অ্যামিভ্যান্টাম্যাব’ নামের এই ইনজেকশন এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি রোগীর টিউমার ছোট করতে পেরেছে। অনেকের ক্ষেত্রে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা গেছে এবং ১৫ জন রোগীর টিউমার সম্পূর্ণভাবে গলে গেছে।

লন্ডনের ইনস্টিটিউট অব ক্যানসার রিসার্চের (আইসিআর) জৈবিক ক্যানসার চিকিৎসাবিষয়ক অধ্যাপক কেভিন হ্যারিংটন বলেন, যেসব রোগীর ক্যানসার কেমোথেরাপি ও ইমিউনোথেরাপি—উভয় চিকিৎসারই প্রতিরোধী (রেজিস্ট্যান্ট) হয়ে উঠেছে, তাদের ক্ষেত্রে এটি নজিরবিহীন ও শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া। এ ধরনের রোগীর জন্য চিকিৎসার বিকল্প খুবই সীমিত। তাই এই উপকারিতা দেখা সত্যিই আশাব্যঞ্জক।

রয়্যাল মার্সডেন এনএইচএস ফাউন্ডেশন ট্রাস্টের কনসালট্যান্ট অনকোলজিস্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করা কেভিন হ্যারিংটন জানান, এই চিকিৎসার মাধ্যমে প্রতি বছর হাজার হাজার ক্যানসার রোগী উপকৃত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্যানসার সম্মেলন ‘আমেরিকান সোসাইটি অব ক্লিনিক্যাল অনকোলজি’র (অ্যাসকো) বার্ষিক সভায় এই ফলাফল উপস্থাপন করার কথা রয়েছে।

বিশ্বের ষষ্ঠ সর্বাধিক প্রচলিত ক্যানসার মাথা ও ঘাড়ের ক্যানসার। এই ট্রায়ালে মাথা ও ঘাড়ের ক্যানসারে আক্রান্ত ১০২ জন রোগীকে অ্যামিভ্যান্টাম্যাব ইনজেকশন দেওয়া হয়েছিল। তাদের মধ্যে ৪৩ জনের টিউমার ছোট হয়ে গেছে বা সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে। আর ২৮ জনের টিউমার উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হয়েছে এবং ১৫ জনের টিউমার পুরোপুরি নির্মূল হয়েছে।

গবেষকরা বলেছেন, ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রেও এই ইনজেকশন একই ধরনের ফলাফল দেখিয়েছে। জনসন অ্যান্ড জনসনের আবিষ্কৃত অ্যামিভ্যান্টাম্যাব বর্তমানে প্রায় ৬০টি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। ফুসফুসের ক্যানসারের পাশাপাশি মলাশয় (কোলোরেক্টাল), মস্তিষ্ক ও পাকস্থলীর ক্যানসারের ক্ষেত্রেও এর কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হচ্ছে।

 

 

এই ‘স্মার্ট’ ইনজেকশন তিনটি ভিন্ন উপায়ে ক্যানসারের বিরুদ্ধে কাজ করে—প্রথমত, এটি ইজিএফআর (এপিডার্মাল গ্রোথ ফ্যাক্টর রিসেপ্টর) নামের এমন একটি প্রোটিনকে বাধা দেয়, যা টিউমারের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে। দ্বিতীয়ত, এটি এমইটি নামের একটি পথও বন্ধ করে দেয়, যেটি ব্যবহার করে ক্যানসারের কোষগুলো প্রচলিত চিকিৎসাকে ফাঁকি দিতে পারে। তৃতীয়ত, এটি রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সক্রিয় করে টিউমারের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সহায়তা করে।

অন্যান্য ক্যানসার চিকিৎসার মতো অ্যামিভ্যান্টাম্যাব শিরায় স্যালাইনের মাধ্যমে না দিয়ে ত্বকের নিচে ছোট একটি ইনজেকশনের মাধ্যমে দেওয়া হয়। ফলে এর চিকিৎসা দ্রুত, সহজ এবং বহির্বিভাগে পরিচালনা করাও সুবিধাজনক। প্রতি তিন সপ্তাহে একবার দেওয়া এই চিকিৎসার বেশির ভাগ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াই ছিল মৃদু বা মাঝারি মাত্রার। ১০ জনের মধ্যে একজনেরও কম রোগীকে এই চিকিৎসা বন্ধ করতে হয়েছে।

এই চিকিৎসায় প্রথম দিকে সুফল পান ৫৬ বছর বয়সী কার্ল ওয়ালশ। ২০২৪ সালের মে মাসে তার জিবে ক্যানসার ধরা পড়ে। এরপর ২০২৫ সালের জুলাইয়ে তিনি রয়্যাল মার্সডেনে ‘অরিগ্যামি-৪’ নামের ওই ট্রায়ালে যোগ দেন। ইংল্যান্ডের বার্মিংহামের বাসিন্দা ওয়ালশ বলেন, আমি এখন প্রায় স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছি। ট্রায়াল শুরু করার আগে ফোলা ও ব্যথার কারণে ঠিকমতো কথা বলতে পারতাম না, খেতেও অনেক কষ্ট হতো। চিকিৎসা শুরুর পর ফোলা অনেক কমে গেছে এবং ব্যথাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। চিকিৎসার মাত্র দুই চক্রের পর থেকেই আমার খাদ্যাভ্যাস স্বাভাবিক হতে শুরু করে এবং ছয় মাসের মধ্যে আমি সব ধরনের খাবার খেতে পারছিলাম। আমার কথাবার্তাও এখন পুরোপুরি স্বাভাবিক।

গবেষকরা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক ক্লিনিক্যাল পরীক্ষাটি মূলত মাথা ও ঘাড়ের ক্যানসারে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ওপর পরিচালিত হয়েছিল। তবে এ পরীক্ষায় হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস (এইচপিভি) পজিটিভ ওরোফ্যারিন্জিয়াল স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমার রোগীরা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। তারা বলছেন, এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ; কারণ এ ধরনের ক্যানসারের চিকিৎসা করা আরও কঠিন। প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো কাজ করা বন্ধ করে দেওয়ার পর এই ধরনের ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের বাঁচার সম্ভাবনা যেখানে খুবই কম, সেখানে অ্যামিভান্টাম্যাব নেওয়া রোগীরা চিকিৎসা শুরুর পর গড়ে সাড়ে ১২ মাস বেঁচে ছিলেন।

আইসিআরের প্রধান নির্বাহী অধ্যাপক ক্রিস্টিয়ান হেলিন বলেন, এই গবেষণা দেখিয়েছে যে, কীভাবে কঠোর বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি তৈরি করা সম্ভব, যা সীমিত চিকিৎসার সুযোগ থাকা রোগীদের ক্ষেত্রেও অর্থপূর্ণ অগ্রগতি এনে দিতে পারে। এর মধ্যে এই মাত্রার প্রতিক্রিয়া এবং বেঁচে থাকার আশাব্যঞ্জক হার অর্জন করা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।


আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

More News Of This Category