মার্কিন পতাকায় আগুন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছবি পদপিষ্ট

ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপ ও হামলার প্রতিবাদে লাতিন আমেরিকা থেকে এশিয়াÑ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। ক্ষুব্ধ আন্দোলনকারীরা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় পতাকায় আগুন দিয়ে এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কুশপুত্তলিকা ও ছবিতে পদাঘাত করে তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। খবর দ্য গার্ডিয়ানের।

আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস এইরেসে মার্কিন দূতাবাসের দিকে বিশাল মিছিল নিয়ে যান বিক্ষোভকারীরা। সেখানে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী আচরণের বিরুদ্ধে সেøাগান দেন। একপর্যায়ে দূতাবাসের অদূরেই যুক্তরাষ্ট্রের পতাকায় আগুন ধরিয়ে দিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা। ইপিএর আলোকচিত্রী হুয়ান ইগনাসিও রনকোরোনির ক্যামেরায় সেই অগ্নিগর্ভ প্রতিবাদের দৃশ্য উঠে এসেছে।

একই চিত্র দেখা গেছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ ইন্দোনেশিয়াতেও। জাকার্তায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের সামনে জড়ো হন শত শত অধিকারকর্মী ও সাধারণ মানুষ। রয়টার্সের আলোকচিত্রী উইলি কুর্নিওয়ানের তোলা ছবিতে দেখা যায়Ñ আন্দোলনকারীরা ভেনেজুয়েলায় মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড ও ফেস্টুন প্রদর্শন করছেন।

বিক্ষোভের ঝাঁজ এতটাই তীব্র ছিল যে, জাকার্তায় আন্দোলনকারীরা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছবি সংবলিত পোস্টার মাটিতে ফেলে পা দিয়ে মাড়িয়ে ধিক্কার জানান। বিশ্বজুড়েই বিক্ষোভকারীরা ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্বের ওপর এই আঘাতকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছেন।

ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিলেন দেলসি রদ্রিগেজ

 

মার্কিন অভিযানে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত ও গ্রেপ্তার হওয়ার পর ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছেন ৫৬ বছর বয়সী দেলসি রদ্রিগেজ। মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) রাজধানী কারাকাসে এক বিশেষ সংসদীয় অধিবেশনে তিনি শপথ গ্রহণ করেন।

 

২০১৮ সাল থেকে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসা দেলসি রদ্রিগেজ শপথ গ্রহণের পর প্রেসিডেন্ট মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটকের ঘটনাকে ‘অপহরণ’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “একটি অবৈধ সামরিক আগ্রাসনের বেদনা নিয়ে আমি দায়িত্ব নিচ্ছি।” তার ভাষ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান লক্ষ্য হবে দেশের শান্তি বজায় রাখা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।

 

সংসদীয় অধিবেশনে নিকোলাস মাদুরোর ছেলে উপস্থিত ছিলেন। একই সময় পার্লামেন্ট ভবনের বাইরে হাজার হাজার সমর্থক বিক্ষোভ প্রদর্শন করে মাদুরোর মুক্তির দাবি জানান।

 

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে ম্যানহাটনের আদালতে শুনানির সময় নিজেকে ‘নির্দোষ’ দাবি করেছেন বর্তমানে মার্কিন হেফাজতে থাকা নিকোলাস মাদুরো। দেলসি রদ্রিগেজের শপথ গ্রহণের মাত্র দুই ঘণ্টা আগে আদালতে হাজির করা হলে মাদুরো নিজেকে একজন ‘সজ্জন ব্যক্তি’ হিসেবে বর্ণনা করেন এবং বলেন, তিনি এখনো ভেনেজুয়েলার বৈধ প্রেসিডেন্ট।

 

তিনি নিজেকে ‘অপহৃত’ ও ‘যুদ্ধবন্দী’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তার বিরুদ্ধে আনা মাদক পাচার ও সন্ত্রাসবাদের চারটি অভিযোগ অস্বীকার করেন। আদালত এই মামলার পরবর্তী শুনানির দিন আগামী ১৭ মার্চ নির্ধারণ করেছেন।

 

উল্লেখ্য, গত শনিবার ভোরে কারাকাসে মার্কিন বাহিনীর একটি বড় মাপের অভিযানের পর নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে নিউইয়র্কের ব্রুকলিনের একটি আটককেন্দ্রে রাখা হয়েছে।

 

ভেনেজুয়েলার এই রাজনৈতিক সংকট নিয়ে জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্র তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রদূত স্যামুয়েল মনকাদা এই অভিযানকে ‘অবৈধ সশস্ত্র হামলা’ বলে অভিহিত করেন। অন্যদিকে জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ অভিযানের পক্ষে অবস্থান নিয়ে বলেন, বিশ্বের বৃহত্তম জ্বালানি ভান্ডার একজন অপরাধীর হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না।

 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন, একটি সুষ্ঠু রাজনৈতিক পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রই ভেনেজুয়েলা ‘পরিচালনা’ করবে। তিনি অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজকে সতর্ক করে বলেন, মার্কিন পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ না করলে তাকে মাদুরোর চেয়েও ‘বড় মূল্য’ দিতে হতে পারে।

 

তবে দেলসি রদ্রিগেজ তুলনামূলক নমনীয় অবস্থান প্রকাশ করে বলেন, আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোর মধ্যে থেকে দেশের উন্নয়নের স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করতে তিনি আগ্রহী।

আমি এখনো প্রেসিডেন্ট, অপহরণ করা হয়েছে— মাদুরো

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটকের পর গতকাল প্রথমবারের মতো আদালতে তোলা হয়। তার বিরুদ্ধে মাদক সন্ত্রাস ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ধ্বংসাত্মক ডিভাইস ব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়েছে।

 

তবে স্থানীয় সময় সোমবার (৫ জানুয়ারি) নিউইয়র্কের আদালতে মাদুরো বলেছেন, “আমি নির্দোষ, আমি দোষী নই। আমি একজন ভদ্র মানুষ এবং এখনো আমার দেশের প্রেসিডেন্ট।” এছাড়া নিজ দেশ থেকে তাকে অপহরণ করে নিয়ে আসা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

 

গত শনিবার মধ্যরাতে মাদুরোর সঙ্গে তার স্ত্রীকেও আটক করে নিয়ে আসে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর ডেল্টা ফোর্সের সেনারা। তার স্ত্রীও আদালতে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন।

 

মাদুরোর নিযুক্ত আইনজীবী আদালতকে জানান, তার ক্লায়েন্ট এখনই জামিন চাইছেন না। তবে ভবিষ্যতে চাইবেন। আদালত মাদুরোর মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেছেন আগামী ১৭ মার্চ।

 

সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানিয়েছে, আদালতের ভেতর একজন স্প্যানিশ ভাষায় চেঁচিয়ে মাদুরোকে উদ্দেশ্য করে বলতে থাকেন ‘আপনি যা করেছেন তার জন্য মূল্য দিতে হবে।’ ওই সময় মাদুরো স্প্যানিশ ভাষায় জবাব দেন, “আমি একজন অপহৃত প্রেসিডেন্ট, যুদ্ধবন্দি।”

 

এরপর তাকে আদালত থেকে বের করে নেওয়া হয়। পরে আদালতের পোডিয়ামে তোলা হয় তার স্ত্রীকে। ওই সময় সেখানে থাকা একজন কাঁদছিলেন। তাকে তখন বিচারক বের হয়ে যেতে বলেন।

আমেরিকা মহাদেশ কোনো শক্তির সম্পত্তি নয়

মার্কিন বাহিনীর অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে আটক করার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘পশ্চিম গোলার্ধে আধিপত্য’-এর কথা বলায়, ‘আমেরিকা কোনো শক্তির সম্পত্তি নয়’, মন্তব্য করেছেন মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাওম।

ট্রাম্প সপ্তাহান্তের সামরিক অভিযানে বামপন্থী নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার ঘটনাকে ১৮২৩ সালের মনরো নীতির হালনাগাদ সংস্করণ হিসেবে বর্ণনা করেন। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেমস মনরোর ঘোষণায় বলা হয়েছিল, লাতিন আমেরিকা অন্য পরাশক্তিদের (তখন ইউরোপ) জন্য ‘বন্ধ’।

সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, ‘মনরো ডকট্রিন গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু আমরা এটাকে অনেক দূর অতিক্রম করেছি।

এখন তারা একে ‘ডনরো ডকুমেন্ট’ বলে।’ 

তিনি আরো বলেন, ‘পশ্চিম গোলার্ধে আমেরিকার আধিপত্য আর কখনো প্রশ্নের মুখে পড়বে না।’

শেইনবাওম সোমবার পাল্টা মন্তব্য করে বলেন, ‘আমেরিকা কোনো মতবাদ বা কোনো শক্তির অধীন নয়। আমেরিকা মহাদেশ তাদের—যে দেশগুলো এটি গঠন করেছে, সেই দেশের জনগণের।

’মার্কিন বাহিনী শনিবার ভোরে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে হামলা চালিয়ে মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করে নিউইয়র্কে নিয়ে যায়, যেখানে তারা মাদক পাচারের অভিযোগে বিচার মোকাবেলা করবেন।

এরপর থেকেই ট্রাম্প অঞ্চলটির অন্যান্য বামপন্থী সরকার—কিউবা, কলোম্বিয়া এবং মেক্সিকো—সম্পর্কেও হুমকি দিয়েছেন। মেক্সিকোকে তিনি বিশেষভাবে মাদক পাচারের বিরুদ্ধে আরো কঠোর হওয়ার আহ্বান জানান।

ইসলামি প্রজাতন্ত্র শত্রুর কাছে নত হবে না ও যারা সহিংসতায় জড়িত, তাদের যথাস্থানে রাখা হবে-খামেনি

ইরানে চলমান বিক্ষোভের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের হুমকির জবাবে কঠোর অবস্থানের কথা জানালেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। শনিবার (৩ জানুয়ারি) প্রচারিত এক বক্তব্যে তিনি বলেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্র শত্রুর কাছে নত হবে না ও যারা সহিংসতায় জড়িত, তাদের যথাস্থানে রাখা হবে। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ খবর জানিয়েছে।

মুদ্রাস্ফীতির চাপ ও রিয়ালের দরপতনে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকট থেকেই সাম্প্রতিক এই বিক্ষোভের সূত্রপাত। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত ১০ জনের বেশি নিহত হয়েছেন। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম তিনজনের মৃত্যুর কথা স্বীকার করেছে । কুর্দি মানবাধিকার সংগঠন হেংগাও শুক্রবার রাতে জানিয়েছে, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী ১৩৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয় যা আগের দিনের তুলনায় ৭৭ জন বেশি।

মুদ্রার দরপতন নিয়ে খামেনি বলেছেন, বাজারের ব্যবসায়ীরা ঠিকই বলছেন। এই পরিস্থিতিতে ব্যবসা করা সম্ভব নয়,এ কথা বলা তাদের অধিকার। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে কথা বলা হবে, কিন্তু দাঙ্গাকারীদের সঙ্গে কথা বলার কোনও অর্থ নেই।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে ,সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দক্ষিণ ও পশ্চিম ইরানের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভের দৃশ্য দেখা যাচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে, যদিও এসব ভিডিও তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা যায়নি। এক ভিডিওতে বিক্ষোভকারীদের অন্যদের রাস্তায় নামার আহ্বান জানাতে দেখা গেছে ।

সম্প্রতি ট্রাম্প ইরান প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ইরান সহিংসভাবে বিক্ষোভকারীদের হত্যা করলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের উদ্ধারে প্রস্তুত রয়েছে । তবে ইরানের বিরুদ্ধে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে, এ বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু বলেননি। এই সম্ভাব্য পদক্ষেপের হুমকি ইরানের নেতাদের ওপর চাপ আরও বাড়িয়েছে। ফলে নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত ইরানের অর্থনীতি সংকুচিত হচ্ছে ও সরকার কিছু অঞ্চলে পানি ও বিদ্যুৎ সরবারহ নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছে ।

 

ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান নিয়ে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা যুক্তরাষ্ট্রে

ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে আনার প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ডেমোক্র্যাট ও স্বতন্ত্র নেতারা ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে বেআইনি ও বিপজ্জনক বলে আখ্যা দিয়েছেন।

ভেনেজুয়েলায় অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে আনা উচিত হয়েছিল কি না—এ প্রশ্নে শুধু আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেই নয়, খোদ যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও তীব্র সমালোচনার ঝড় উঠেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স, ডেমোক্র্যাট নেত্রী কমলা হ্যারিস এবং নিউ ইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানিসহ প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা।

রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ভারমন্ট থেকে নির্বাচিত স্বতন্ত্র সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানের কড়া সমালোচনা করেন। তিনি এই হামলাকে ‘বেআইনি, বিপজ্জনক, সংবিধান ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনকারী’ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, এটি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিরও পরিপন্থি।

স্যান্ডার্স তার পোস্টে বলেন, ট্রাম্প ‘আমেরিকা সর্বাগ্রে’ শপথে প্রচার চালিয়েছিলেন। অথচ এখন তিনি ভেনেজুয়েলার শাসনক্ষমতা পরিচালনা করতে চাইছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই নাগরিকরা নানামুখী সংকটে ভুগছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রেসিডেন্টের উচিত দেশের প্রধান সমস্যাগুলোর দিকে নজর দেওয়া। বিদেশে অবৈধ ও দুঃসাহসিক সামরিক অভিযানের ইতি টানা প্রয়োজন।

স্যান্ডার্স আরও বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কোনো এখতিয়ার নেই একতরফাভাবে দেশকে যুদ্ধের মধ্যে টেনে নিয়ে যাওয়ার। এমনকি নিকোলাস মাদুরোর মতো এক দুর্নীতিবাজ, বর্বর একনায়কের বিরুদ্ধেও তিনি একক সিদ্ধান্তে সামরিক ব্যবস্থা নিতে পারেন না।”

এ ধরনের বেপরোয়া অভিযানের লাগাম টানতে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে দ্রুত একটি যুদ্ধ ক্ষমতা প্রস্তাবনা পাসের আহ্বান জানান স্যান্ডার্স। তার মতে, এ ধরনের অভিযান শুধু যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নয়, বরং গোটা বিশ্বের নিরাপত্তার জন্যও হুমকিস্বরূপ।

স্যান্ডার্সের মতোই ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের নিন্দা জানিয়েছেন ডেমোক্র্যাট নেত্রী ও সাবেক মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস। তিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পদক্ষেপকে সরাসরি ‘বেআইনি’ বলে আখ্যা দেন। হ্যারিসের মতে, “ট্রাম্প যা করেছেন, সেটি কখনোই যুক্তরাষ্ট্রকে সুরক্ষিত বা শক্তিশালী করবে না।”

হ্যারিস আরও বলেন, মাদুরোকে স্বৈরাচারী, নিষ্ঠুর কিংবা অবৈধ শাসক বলেই হোক না কেন, এই যুক্তি দেখিয়ে ভেনেজুয়েলায় সামরিক হামলা চালানো যায় না। আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনৈতিক নীতিমালা উপেক্ষা করে নেওয়া এমন সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে আরও বড় সংকট তৈরি করতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

অন্যদিকে, নিউ ইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানিও ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলা আক্রমণের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তার ভাষায়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কার্যত ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন।

মামদানি বলেন, এভাবে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের চেষ্টা শুধু বিদেশে বসবাসকারী ভেনেজুয়েলানদের ওপরই নয়, বরং নিউ ইয়র্কের বাসিন্দাদের জীবনেও প্রভাব ফেলবে। কারণ, নিউ ইয়র্ক শহরে হাজার হাজার ভেনেজুয়েলার নাগরিক বসবাস করে, যারা এই সংঘাতের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবের মুখে পড়তে পারেন।

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ভেনেজুয়েলা থেকে অপরাধীরা অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করছে। জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্যই মাদুরোকে সরানো প্রয়োজন ছিল বলে দাবি করছে ট্রাম্প প্রশাসন। পাশাপাশি মাদুরোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে মাদক সন্ত্রাস ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগও তোলা হয়েছে।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলভান্ডারই আসলে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য। তাদের মতে, নিরাপত্তা ও অপরাধ দমনের যুক্তি দেখালেও এর পেছনে ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থই বেশি কাজ করছে।

মাদুরো ও তার স্ত্রীকে নিউইয়র্কের আদালতে তোলা হবে আজ

ভেনেজুয়েলার অপহৃত প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে সোমবার (৫ জানুয়ারি) যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের একটি আদালতে হাজির করা হচ্ছে।

আদালতের এক মুখপাত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, আজ স্থানীয় সময় দুপুরে ম্যানহাটনের ফেডারেল আদালতে তাদের বিরুদ্ধে আনা মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানের মামলার আইনি প্রক্রিয়া শুরু হবে। যদিও শুরু থেকেই মাদুরো তার বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন, তবে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিনের তদন্তের ভিত্তিতে এই বিচারকার্য শুরু করতে যাচ্ছে।

শনিবার ভেনেজুয়েলায় মার্কিন বিশেষ বাহিনীর এক রুদ্ধশ্বাস অভিযানে তাদের বন্দি করার পর সরাসরি নিউইয়র্কে উড়িয়ে নেওয়া হয়। বর্তমানে তারা ব্রুকলিনের মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টারে বন্দি রয়েছেন।

মাদুরোর অনুপস্থিতিতে ভেনেজুয়েলার আদালতের নির্দেশে ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তবে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছ থেকে তীব্র হুঁশিয়ারির সম্মুখীন হয়েছেন তিনি।

এএন

এবার কলম্বিয়া ও কিউবায় সরকার পতনের হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সামরিক অভিযানের মাধ্যমে আটক করে নিউইয়র্কে নিয়ে আসার পর এবার কলম্বিয়া ও কিউবার সরকার নিয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

রোববার (৪ জানুয়ারি) রাতে প্রেসিডেন্টের রাষ্ট্রীয় বিমান ‘এয়ারফোর্স ওয়ান’-এ সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোকে সরাসরি আক্রমণ করে বলেন যে, দেশটিতে একজন ‘অসুস্থ ব্যক্তি’ শাসন চালাচ্ছেন যিনি যুক্তরাষ্ট্রে কোকেন সরবরাহ করতে পছন্দ করেন।

ট্রাম্পের মতে, কলম্বিয়ার বর্তমান সরকার খুব বেশি দিন ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবে না। আল-জাজিরার প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, লাতিন আমেরিকার এই অঞ্চলগুলোতে মার্কিন প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যে ট্রাম্পের এই মন্তব্য এক নতুন ভূ-রাজনৈতিক উত্তজনা সৃষ্টি করেছে।

সাংবাদিকরা যখন ট্রাম্পের কাছে জানতে চান যে কলম্বিয়াতেও ভেনেজুয়েলার মতো মার্কিন সামরিক অভিযানের কোনো পরিকল্পনা আছে কি না, তখন তিনি রহস্যজনকভাবে উত্তর দেন, ‘শুনতে ভালোই লাগছে।’ কলম্বিয়ার পাশাপাশি তিনি কিউবার ভবিষ্যৎ নিয়েও ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন।

ট্রাম্পের বিশ্বাস, কিউবা বর্তমানে পতনের মুখে রয়েছে এবং সেখানে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের প্রয়োজন নাও হতে পারে। তার মতে, কিউবার আয়ের প্রধান উৎস ছিল ভেনেজুয়েলা এবং দেশটির জ্বালানি তেল। যেহেতু ভেনেজুয়েলার নিয়ন্ত্রণ এখন মার্কিন প্রভাবের বলয়ে চলে আসছে, তাই কিউবার বর্তমান সরকারের টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে বলে তিনি দাবি করেন।

উল্লেখ্য যে, গত শনিবার মেক্সিকোর নিকটবর্তী দেশ ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মার্কিন এলিট ফোর্স ‘ডেল্টা ফোর্স’ ব্যাপক অভিযান পরিচালনা করে। তারা মাদুরোর অত্যন্ত সুরক্ষিত ‘সেফ হাউস’ থেকে তাকে ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে বন্দি করে দীর্ঘ ২ হাজার ১০০ মাইল পথ পাড়ি দিয়ে নিউইয়র্কে নিয়ে আসে।

ট্রাম্প প্রশাসন মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক পাচারের গুরুতর অভিযোগ এনেছে এবং আজ সোমবার স্থানীয় সময় দুপুরে তাদের ম্যানহাটনের ফেডারেল আদালতে হাজির করার কথা রয়েছে। ভেনেজুয়েলার এই নাটকীয় পরিবর্তনের পর ট্রাম্পের সাম্প্রতিক এই বক্তব্য প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে চরম আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

সূত্র: আল জাজিরা

মাদুরো ও তার স্ত্রীকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার আহ্বান-ভেনিজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট

ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক অভিযানের মাধ্যমে নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নেওয়ার পর দেশটির শাসনভার এখন নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের হাতে।

ভেনেজুয়েলার সংবিধানের ২৩৩ ও ২৩৪ ধারা অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টের অনুপস্থিতিতে ভাইস প্রেসিডেন্টই ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।  সেই ধারাবাহিকতায় দেশটির সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে গত শনিবার বিকেলে দায়িত্ব গ্রহণ করেন ৫৬ বছর বয়সী ডেলসি, যিনি একই সঙ্গে অর্থ ও তেলমন্ত্রী হিসেবেও কাজ করছেন।

দায়িত্ব নেওয়ার পর জাতীয় প্রতিরক্ষা কাউন্সিলের অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার সময় তিনি মাদুরো দম্পতির অবিলম্বে মুক্তি দাবি করেন এবং মার্কিন অভিযানকে আন্তর্জাতিক আইন ও সার্বভৌমত্বের ওপর এক নগ্ন হস্তক্ষেপ বলে নিন্দা জানান।

দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ‘চাভিজমো’ আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ ডেলসি রদ্রিগেজকে নিকোলাস মাদুরোর সবচেয়ে আস্থভাজন ও কট্টরপন্থী কর্মকর্তাদের একজন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।  কারাকাসে জন্মগ্রহণকারী এই আইনজীবী এর আগে তথ্য ও যোগাযোগমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।  পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মাদুরো সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগগুলো শক্ত হাতে মোকাবিলা করেছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, ডেলসি কোনো নমনীয় বা উদারপন্থী বিকল্প নন, বরং তিনি ভেনেজুয়েলা সরকারের শক্তিশালী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের একজন, যার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়সহ পুরো সরকারি ব্যবস্থার ওপর ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ

ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হামলা ও অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক তুলে আনার পর যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়েছে।

যুদ্ধবিরোধী স্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড–ব্যানার নিয়ে রাস্তায় নেমে এসেছেন সাধারণ মানুষ। কারও কারও হাতে ভেনেজুয়েলার পতাকাও দেখা গেছে।

সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওয়াশিংটন, নিউইয়র্ক, বোস্টন, মিনেপোলিসসহ বিভিন্ন শহরে যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ হচ্ছে।

শনিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরসকে আটকের তথ্য ঘোষণা করার পর জানান, যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে ভেনেজুয়েলা পরিচালনা করবে। শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র এই কাজ অব্যাহত রাখবে বলেও জানান তিনি।

এরপরই যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়। সূত্র: সিএনএন