করোনা মহামারীকালে ভুয়া কোভিড সার্টিফিকেট প্রদানের কারণে ব্যাপক সমালোচিত প্রতারক রিজেন্ট হাসপাতালের সাহেদের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট জমা দিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তদন্তে তার বিরুদ্ধে ১১ কোটি টাকা বিদেশে পাচারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। বালি ও পাথরসহ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে কোটি কোটি টাকার মালামাল নিয়েও সংশ্লিষ্টদের পাওনা টাকা দেননি তিনি। টাকা চাইলে উল্টো গুলি করে মেরে ফেলার হুমকি দিতেন। চার্জশিটে এসব তথ্য উঠে এসেছে। গত মঙ্গলবার ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের সংশ্লিষ্ট শাখায় চার্জশিট জমা দেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম বিভাগের পরিদর্শক মো. মনিরুজ্জামান।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২০ সালের ২৫ আগস্ট প্রাথমিক অনুসন্ধানের পর সাহেদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে মামলা দায়ের করেন সিআইডির এসআই ইব্রাহীম হোসেন। প্রায় দেড় বছর তদন্তের পর সেই মামলার চার্জশিট আদালতে জমা দেওয়া হলো। চার্জশিটে সাহেদ ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে ১১ কোটি ২ লাখ ২৭ হাজার ৮৯৭ টাকা মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ আনা হয়েছে।
নানারকম প্রতারণার মধ্যে একটি হচ্ছে, বেশি দামে পণ্য কিনে কম দামে বিক্রি করতেন। কিন্তু যে প্রতিষ্ঠান থেকে পণ্য কিনতেন, তার দাম পরিশোধ করতেন না। বিক্রির পুরো টাকাই হাতিয়ে নিতেন।
তদন্ত সূত্র জানায়, প্রতারক সাহেদ ২০২০ সালের ২২ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত হাজী মো. এখলাছ খান নামে এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে এক কোটি ৭৯ লাখ ৭৬ হাজার ৮৪৩ টাকার বালি ও পাথর ক্রয় করেন। কিন্তু ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী তার কাছে টাকা চাইলে তাকে গুলি করে হত্যার হুমকি দেন। নেত্রকোনার ড. রফিকুল ইসলাম হিলালী নামের একজনের কাছ থেকে নারায়ণগঞ্জের জলসিঁড়ি প্রকল্পে বালি ভরাটের জন্য ৪২ লাখ ৫৭ হাজার ৫৫৯ টাকার, হাফিজ উদ্দিন বাহার নামে পাবনার এক লোকের কাছ থেকে ৮১ লাখ ৭২ হাজার ১৮৬ টাকার, কুমিল্লার আব্দুল্লাহ আল মামুন নামে এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ৩১ লাখ ৪৩ হাজার ৫০০ টাকার, গাজীপুরের ইমতিয়াজ হাবিব সিনহা নামে একজনের কাছ থেকে ৫৮ লাখ ১ হাজার ৯৪৪ টাকার এবং কিশোরগঞ্জের এসএম শিপন নামে এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ৬১ লাখ টাকার বালি কিনে টাকা পরিশোধ করেননি সাহেদ।
এ ছাড়া চট্টগ্রামের সাইফুদ্দিন নামে একজনের কাছ থেকে সিএনজি অটোরিকশার রুট পারমিট করে দেওয়ার নামে ৬৫ লাখ টাকা নেন। উত্তরার হোটেল মিলিনা জোর করে ভাড়া নিয়ে করোনা রোগীদের কোয়ারেন্টিন পরিচালনা করেন। কিন্তু হোটেল ভাড়ার ১ কোটি ৩৬ লাখ ১৩ হাজার ৫০ টাকা পরিশোধ না করে আত্মসাৎ করেন। শুধু তাই নয়, সিরাজুল ইসলাম নামে এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে পূর্বাচলের ওয়েস্টার্ন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কন্টাক্টে এক্সকাভেটর ভাড়া, ওয়াটার পাম্পের ভাড়া ও বিটুমিন ক্রয় বাবদ ৯৫ লাখ ৮১ হাজার ৫৮৮ টাকা আত্মসাৎ করেন।
তদন্ত সূত্রে আরও জানা যায়, প্রতারক সাহেদ আকসিড করপোরেশন নামে একটি প্রতিষ্ঠানের সহকারী ম্যানেজার রেজাউল করিমের কাছে মেট্রোরেল প্রকল্পের কাজে নিয়োজিত ৭৬ কর্মীর জন্য ভুয়া করোনা সার্টিফিকেট দিয়ে ২ লাখ ৬৬ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক মনিরুজ্জামান আমাদের সময়কে বলেন, তদন্তের পর সাহেদ ছাড়াও চার্জশিটে মাসুদ পারভেজ, কাজী রবিউল ইসলাম, রিজেন্ট হাসপাতাল লিমিটেড, রিজেন্স কেসিএস লিমিটেড ও রিজেন্ট ডিসকভারি ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস লিমিটেডকেও আসামি করা হয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, কোভিড মহামারী শুরু হলে সাহেদ তার প্রধান সহযোগী মাসুদ পারভেজের মাধ্যমে রিজেন্ট ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেল লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠান চালু করেন। এ প্রতিষ্ঠানের নামে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকে একটি হিসাবও খোলা হয়। ওই হিসাবটি পরিচালনা করেন সাহেদের এই প্রধান সহযোগী মাসুদ এবং তার বাবা সিরাজুল করিম। ২০২০ সালের ১ মার্চ থেকে ৯ জুলাই পর্যন্ত ওই হিসাবটিতে সর্বমোট ৩ কোটি ১১ লাখ ৯০ হাজার ২২৭ টাকা জমা হয়। সিআইডির তদন্তে প্রতীয়মান হয়েছে, সাহেদ কোভিড সার্টিফিকেট (ভুয়া) দেওয়ার নামে জনপ্রতি সাড়ে তিন হাজার টাকা করে নিতেন। সেই অর্থ এই হিসাবে জমা হতো। জালিয়াতি ও প্রতারণার অর্থ রাখতে সাহেদ তার নিজ ও সহযোগীদের নামে ছাড়াও রিজেন্ট হাসপাতাল এবং অস্তিত্বহীন ১২টি প্রতিষ্ঠানের নামে মোট ৪৩টি হিসাব পরিচালনা করতেন। এসব হিসাবে মোট ৯১ কোটি ৭০ লাখ ৪৮ হাজার ৫৪৭ টাকা জমা হয়। এর মধ্যে ৯০ কোটি ৪৭ লাখ ৯১ হাজার ৫২৪ টাকা উত্তোলন করেন। বর্তমানে এসব হিসাবে ২ কোটি ৪ লাখ ৩৯ হাজার ১১ টাকা স্তিতাবস্থায় রয়েছে।
সূত্র জানায়, তদন্তে সাহেদের প্রধান সহযোগী মাসুদ পারভেজের ১৫টি ব্যাংক হিসাবের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব হিসাবেও প্রায় ৪ কোটি টাকার লেনদেন পাওয়া গেছে।
আদালতে জমাকৃত চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে, সাহেদ ও তার সহযোগীরা প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে অর্জিত ১১ কোটি ২ লাখ ২৭ হাজার ৮৯৭ টাকা ব্যাংক থেকে উত্তোলনের পর স্থানান্তর-রূপান্তর-হস্তান্তরের মাধ্যমে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২-এর বিভিন্ন ধারায় অপরাধ করেছেন। প্রতারণা ও জালিয়াতির কাজে ব্যবহারের জন্য সাহেদের মালিকানাধীন তিনটি প্রতিষ্ঠানকেও চার্জশিটে অভিযুক্ত করা হয়।
You must be logged in to post a comment.