কোটা আন্দোলন ঘিরে সহিংসতায় এ পর্যন্ত ১৪৭ মৃত্যু: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

দেশে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সহিংসতায় এ পর্যন্ত ১৪৭ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। আজ রোববার বিকেলে সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের তিনি এ তথ্য জানান।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা নিয়ে দেশ-বিদেশে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। কখনো বলা হচ্ছে ৫০০, কখনো বলা হচ্ছে এক হাজার। সে জন্য সরকারের কাছে যে হিসেব ছিল সেটি দেওয়া হলো। বিভিন্ন হাসপাতাল, বিভিন্ন জেলা থেকে নিহতের এ সংখ্যা পাওয়া গেছে। নিহতদের মধ্যে পুলিশ, আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী, শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ রয়েছে।

আসাদুজ্জামান খান বলেন, ‘মৃতের সংখ্যা নির্ণয়ে আরও অনুসন্ধান চলছে। নিহতদের মধ্যে কতজন নারী, কতজন পুরুষ কিংবা কোন পেশার কতজন রয়েছে সেটি নির্ধারণের কার্যক্রমও চলছে। এই ধরনের হত্যাকাণ্ড, বর্বরোচিত আক্রমণ পৃথিবীর কোনো সভ্য দেশ দেখেছে বলে আমার মনে হয় না। তাঁরা একটা হাসপাতাল পর্যন্ত রেডি রেখেছে, কেউ ইট কিংবা লাঠির আঘাতে আহত হলে তাঁদের সেখানে নিয়ে চিকিৎসা করিয়ে সুস্থ করে আরেক দল এসেছে। আগে থেকে একটা পরিকল্পিতভাবে আক্রমণগুলো করেছে।’

নিহতের সংখ্যা নিয়ে অনেকে বিভ্রান্তি হচ্ছে, অনেকে অনেক কিছু বলছেন। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সহিংস ঘটনায় নিহতদের তালিকা পাওয়া গেছে। এই তালিকা আরও যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। আরও দু-একজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেলে তাঁদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।’

সহিংস ঘটনায় নিহত পুলিশ সদস্যদের ছবি দেখিয়ে মন্ত্রী বলেন, হামলাকারীদের সঙ্গে পুলিশ যখন পেরে উঠতে পারছিল না, তখন সেনাবাহিনীকে ডাকা হয় এবং দেশে কারফিউ জারি করা হয়। বর্তমানে দেশ ক্রমান্বয়ে স্বাভাবিক হয়ে আসছে। কারফিউ শিথিল করা হচ্ছে। পরিবেশ আরও স্বাভাবিক হলে কারফিউ তুলে দেওয়া হবে।

দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্লক রেইড দিয়ে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, সেখানে শিশুদেরও গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। এতে মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে—এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, শিশুদের গ্রেপ্তারের কথা উদ্দেশ্যমূলকভাবে বলা হচ্ছে। এ কাজে (সহিংসতা) টাকার বিনিময়ে কিশোর গ্যাংদের কাজে লাগানো তথ্য আছে। দোষী ব্যক্তিদের অবশ্যই শনাক্ত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে। সে ক্ষেত্রে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

পুলিশের গুলি ছোড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পুলিশকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, তাঁদের অযথা গুলি করার দরকার হয় না। প্রতিটি গুলির হিসেব তাঁদের দিতে হয়। প্রতিটি মৃত্যুর জবাবদিহি করতে হয়। পুলিশ অযথা গুলি করেছে, শিশুকে মেরে ফেলেছে। এগুলো সম্পূর্ণই গুজব, অপপ্রচার।

দেশব্যাপী গণগ্রেপ্তারের নির্দোষ মানুষকেও হয়রানি করা হচ্ছে এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে আসাদুজ্জামান খান বলেন, বিনা কারণে কাউকে গ্রেপ্তার করা হবে না। গোয়েন্দা বাহিনী পুলিশকে তালিকা করে দিয়েছে। ভিডিও ফুটেজ দেখে প্রত্যেকটি গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।

মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়বে কিনা জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এই মুহূর্তে তা বলা যাচ্ছে না। তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। সেখানে আহত কেউ মারা গেলে তালিকায় যুক্ত হবে।

মৃত্যুর তালিকায় কতজন ছাত্র, কতজন পুলিশ ও অন্যান্য কারা রয়েছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এই মুহূর্তে নিহতদের সম্পর্কে বিস্তারিত বলা সম্ভব নয়। তালিকা হাতে পাওয়া গেছে। তাঁদের সম্পর্কে তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলছে।

দেশব্যাপী বিভিন্ন সরকারি স্থাপনায় হামলার বিষয়ে তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তাঁরা বর্বরোচিতভাবে সরকারি স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। তাঁরা মাইকে ডেকে পুলিশকে টার্গেট করে আক্রমণ করেছে। এই আক্রমণ থেকে সাংবাদিকেরাও রেহাই পাননি। নারায়ণগঞ্জে একজন নারী সাংবাদিকের ওপর পৈশাচিক উপায়ে আক্রমণ করা হয়েছে।

সহিংসতায় নিহত ৩৪ জনের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী

কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সহিংসতায় নিহত ৩৪ জনের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা হিসেবে পারিবারিক সঞ্চয়পত্র এবং নগদ অর্থ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। 

রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নিহত ৩৪ জনের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আজ সকালে গণভবনে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

প্রধানমন্ত্রী নিহত স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেন, তাদের খোঁজ-খবর নেন। অনেকে প্রধানমন্ত্রীকে জড়িয়ে ধরে কাঁন্নায় ভেঙে পড়েন। এসময় আবেগাপ্লুত শেখ হাসিনাকেও অশ্রুসজল হতে দেখা যায়। প্রধানমন্ত্রী তাদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন।

অশ্রু সজল প্রধানমন্ত্রী তাদের সান্ত্বনা দিয়ে বলেন,  আমাকে দেখেন, আমি কত শোক নিয়ে বেঁচে আছি।

এক রাতে বাবা-মা, ভাইসহ নিজের স্বজন হারানোর কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, আপনাদের সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা নাই। আপনাদের কষ্ট আমি বুঝি।
এ সময় গণভবনের ব্যাংকোয়েট হলে এক হৃদয়বিদারক পরিবেশ সৃষ্টি হয়।

প্রধানমন্ত্রী ৩৪ জনের পরিবারের সদস্যদের হাতে আর্থিক সহায়তা হিসেবে পারিবারিক সঞ্চয়পত্র এবং নগদ অর্থ তুলে দেন।

এসময় গণভবনে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরিন শারমিন চৌধুরী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।

রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিনষ্টকারীদের বিচার জনগণকেই করতে হবে: প্রধানমন্ত্রী

আজ বৃহস্পতিবার সকালে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত মিরপুর-১০ মেট্রোরেল স্টেশন পরিদর্শন শেষে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। পরিদর্শনের একপর্যায়ে তিনি আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন।

সরকার প্রধান বলেন, ‘সাধারণ মানুষ যেন নির্বিঘ্নে কর্মক্ষেত্র এ পৌঁছাতে পারে সেটা সুনিশ্চিত করা হবে। দেশ যাতে আর্থিকভাবে সচ্ছল হতে পারে সেই চেষ্টাই করব। এ দেশের মানুষ রক্ত দিয়ে দেশ স্বাধীন করেছে, সেটা ব্যর্থ হতে পারে না। যে স্থাপনাগুলো মানুষের জীবনকে সহজ করে, সেগুলো ধ্বংস করা আসলে কোন ধরনের মানসিকতা? ঢাকা শহর যানজটে নাকাল থাকলেও মেট্রো স্বস্তি দিয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির এই পরিবহন এভাবে ধ্বংস করেছে তা মানতে পারছি না।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘গেল ১৬ বছরে দেশের অভাবনীয় উন্নয়ন করা হয়েছে। যার সুফল সাধারণ মানুষ পাচ্ছে। এগুলোর ওপর এত ক্ষোভ কেন? রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিনষ্টে সাধারণ মানুষেরই কষ্ট হবে। সেটা কি সাধারণ মানুষ ভেবেছে? যারা এই কষ্ট তৈরি করল, তাদেরকে জনগণেরই প্রতিহত করতে হবে। এসব তাণ্ডব যারা চালিয়েছে, তাদের বিচার জনগণকেই করতে হবে। দেশের মানুষের জীবনমান উন্নত করতে কাজ করে যাচ্ছি।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘কোটা আন্দোলনকারীদের যেমন দাবি ছিল, তার থেকে বেশি পূরণ করা হয়েছে। তাহলে এখনো কিসের আন্দোলন। তাদের দাবি ক্ষণে ক্ষণে পরিবর্তন হয়েছে। যা ধ্বংসযজ্ঞকে সুযোগ করে দিচ্ছে।

কোটাপ্রথা নিয়ে আন্দোলন: এত দিন যা যা ঘটেছে

শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গত ছয়দিনে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে দফায় দফায় ব্যাপক সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় শিক্ষার্থী, পুলিশ ও পথচারীসহ এখন পর্যন্ত ১৯৭ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে দেশের কয়েকটি গণমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে। আহতের সংখ্যা বলা হয়েছে দুই সহস্রাধিক। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা জানানো হয়নি।

পত্রিকাগুলোকে সূত্র ধরে তারিখ অনুযায়ী সেসব খবরের কিছু কিছু এখানে তুলে ধরা হলো।

১৮ জুলাই, বৃহস্পতিবার

এদিন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের কমপ্লিট শাটডাউন বা সর্বাত্মক অবরোধ কর্মসূচি ছিল। এই কর্মসূচিতে ঢাকাসহ সারা দেশ প্রায় অচল হয়ে পড়ে। রাজধানী ছাড়াও দেশের ৪৭টি জেলায় দিনভর বিক্ষোভ, অবরোধ, পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, পুলিশের হামলা-গুলি, পুলিশের ওপর হামলা ও সংঘাতের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় ২৭ জন নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। আহত হয়েছেন অন্তত দেড় হাজার। (নিহতের সংখ্যা ওই দিন পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে। পরদিন হালনাগাদ করা হয়েছে।)

আন্দোলনকারীরা এদিন ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ চালান। বহু সরকারি প্রতিষ্ঠানে হামলা করা হয়। বাংলাদেশ টেলিভিশন, উত্তরা পূর্ব থানা, মেট্রোরেল স্টেশন, সেতু ভবন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দপ্তর, ডাটা সেন্টারসহ সরকারি গুরুত্বপূর্ণ অনেক স্থাপনায় হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়।

বিটিভির সদর দপ্তর থেকে আন্দোলনকারীদের সরাতে রাতে বিজিবি ও পুলিশ যৌথ অভিযান চালায়। ডাটা সেন্টার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সারা দেশে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ হয়ে যায়।

বহু শিক্ষার্থী মারা গেছে দাবি করে পরদিন শুক্রবারও কমপ্লিট শাটডাউন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন।

১৯ জুলাই, শুক্রবার

কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচির ২য় দিন ছিল শুক্রবার। এদিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গুলি ও সংঘর্ষে অন্তত ৪৪ জন নিহত হন বলে প্রাথমিকভাবে তথ্য প্রকাশ করে কয়েকটি পত্রিকা। আর সারা দেশে নিহতের সংখ্যা বলা হয় ৫৬ জন। যদিও পরে হতাহতের সংখ্যা আরও বেড়েছে বলে এর পরের দিনের পত্রিকায় জানানো হয়। হতাহতদের মধ্যে ছিলেন শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী, পুলিশ, সাংবাদিক, পথচারীসহ অনেক সাধারণ মানুষ। এদিন আহত হন আরও কয়েকশ মানুষ।

দুপুরের পর এদিন রাজধানীর বিআরটিএ কার্যালয়সহ বেশ কিছু সরকারি প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। এদিনও মেট্রোরেলের কয়েকটি স্টেশন হামলা-ভাঙচুরের শিকার হয়। জ্বালিয়ে দেওয়া হয় এলিভেডেট এক্সপ্রেসওয়ের টোল প্লাজা। এছাড়া পিবিআই-এর বনশ্রী ও নারায়ণগঞ্জ শাখায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়।

নরসিংদীর জেলা কারাগারে নজিরবিহীন হামলা চালিয়ে সেদিন ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়। পালিয়ে যায় ৮ শতাধিক আসামি। লুট করা হয় অস্ত্র ও গোলাবারুদ।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, আন্দোলনকারীদের মধ্যে অনুপ্রবেশ করে বিএনপি-জামায়াত ও জঙ্গিরা এসব নাশকতার ঘটনা ঘটিয়েছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শুক্রবারই সারা দেশে কারফিউ জারি করে সরকার। মোতায়েন করা হয় সেনাবাহিনী।

শুক্রবার রাতে আন্দোলনকারীরা ৯ দফা দাবি পেশ করেন। এসব দাবি না মানা পর্যন্ত ‘শাটডাউন’ চলবে বলে জানানো হয়। (তবে আইনমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর শিক্ষার্থীরা টিভি মিডিয়ায় ৮ দফা দাবি উত্থাপন করেন)

রাতে সারা দেশে কারফিউ জারি করে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়।

২০ জুলাই, শনিবার

প্রথম দিকে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে ছাত্রলীগের সংঘর্ষ হয়, পরে তাদের সঙ্গে যোগ দেয় পুলিশ। ভাঙচুর-সংঘর্ষে টালমাটাল পরিস্থিতি সামলাতে পুলিশের সঙ্গে মাঠে নামে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। তাতেও পরিস্থিতি দিন দিন বেসামাল হয়ে পড়ছিল। সেই অবস্থায় জারি করা হয় কারফিউ। রাতারাতি মাঠে নামে সেনাবাহিনী। তারপরও বিক্ষোভ দমানো যায়নি। পথে পথে সেনাসদস্যদের টহলের পরও শনিবার রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে এবং ঢাকার বাইরে কয়েক জায়গায় ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। এতে প্রাণহানি হয়েছে ৪৫ জনের মতো।

রামপুরা-বাড্ডা এদিনও পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ চলছিল। তবে এবার পুলিশের সঙ্গে মাঠে ছিল সেনাবাহিনীও। বিক্ষোভকারীরা পুলিশ ও সেনাবাহিনীর উদ্দেশে ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও সড়কে আগুন জ্বালিয়ে স্লোগান দেয়। তাদের লক্ষ্য করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা গুলি চালান। দিনভর দফায় দফায় এ সংঘর্ষ চলতে থাকে। রামপুরার মতো যাত্রাবাড়ীর শনির আখড়া ও কদমতলীর অবস্থাও ছিল একই রকম।

ঢাকার বাইরের পরিস্থিতিও প্রায় একই রকম ছিল। টঙ্গীতে শিল্প পুলিশের কার্যালয়, পুলিশ বক্স এবং বিআরটিএ প্রকল্পের চলন্ত সিঁড়িতে আগুন দিয়েছে বিক্ষোভকারীরা। এ ছাড়া টঙ্গী থানা এবং সিটি করপোরেশনের আঞ্চলিক কার্যালয়ে ভাঙচুর চালিয়েছে তারা। সিটি করপোরেশনের ১১টি গাড়িসহ প্রায় ৪০টি গাড়িতে ভাঙচুর ও আগুন দেয় বিক্ষোভকারীরা। এ ছাড়া চেরাগ আলী এলাকায় বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যাল লিমিটেডের কারখানায় হামলা চালিয়ে তিনটি কাভার্ড ভ্যানে আগুন দেওয়া হয়।

ময়মনসিংহের গৌরীপুরে পুলিশের গুলিতে বিক্ষোভরত তিন শিক্ষার্থী নিহত হন। দুপুর ১২টার দিকে কলতাপাড়া এলাকার ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ মহাসড়ক অবরোধ করা হয়। পুলিশ বাধা দিলে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। গাজীপুর-ময়মনসিংহ ছাড়া আরও কয়েক জেলায় ভাঙচুর চালানো হয়। সেখানেও তাদের সংঘর্ষ হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে।

এদিন সরকার পরের ২ দিনের জন্য সারা দেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে।

২১ জুলাই, রোববার

কোটা পুনর্বহাল-সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায় বাতিল (রদ ও রহিত) করে আপিল বিভাগ রায় প্রদান করেন। রায়ের একটি অংশে কোটা কত শতাংশ রাখা যায় সে বিষয়ে সরকারকে নির্দেশনা দেন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ।

এতে বলা হয়, মেধাভিত্তিক ৯৩ শতাংশ; মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনার সন্তানদের জন্য ৫ শতাংশ; ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ১ শতাংশ এবং প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের জন্য ১ শতাংশ কোটা নির্ধারণ করা হলো। তবে নির্ধারিত কোটায় যোগ্য প্রার্থী না পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কোটার শূন্য পদগুলো সাধারণ মেধাতালিকা থেকে পূরণ করতে হবে।

এই নির্দেশনার আলোকে সরকারের নির্বাহী বিভাগকে অনতিবিলম্বে প্রজ্ঞাপন জারি করতে নির্দেশ দেন আপিল বিভাগ।

রায়ে বলা হয়, এই নির্দেশনা ও আদেশ সত্ত্বেও সরকার প্রয়োজনে ও সার্বিক বিবেচনায় নির্ধারিত কোটা বাতিল, সংশোধন বা সংস্কার করতে পারবে।

এদিন পত্রিকাগুলো খবর প্রকাশ করে পাঁচ দিনের সহিংসতায় মৃত্যু বেড়ে ১৭০ জনে দাঁড়িয়েছে। আহত অনেকের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হওয়ায় এবং আগের কয়েকদিনের আরও কিছু মৃত্যুর সংবাদ নিশ্চিত হওয়ার কারণে নিহতের সংখ্যা বেড়েছে বলে জানানো হয়। সাংবাদিকদের হিসাবে সহিংসতায় মঙ্গলবার ৬ জন, বৃহস্পতিবার ৪৪ জন, শুক্রবার ৭৫ জন, শনিবার ২৬ জন এবং রোববার ১৯ জন নিহত হন।

একই দিন বিরাজমান পরিস্থিতি নিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ৫৬ সমন্বয়কের যৌথ বিবৃতি’ শিরোনামে একটি খুদে বার্তা গণমাধ্যমকর্মীদের পাঠানো হয়। যৌথ বিবৃতিতে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ (সর্বাত্মক অবরোধ) কর্মসূচি আরও জোরদার করার আহ্বান জানানো হয়। এতে বলা হয়, শুধু আদালতের রায়ের মাধ্যমে হত্যার দায় এড়াতে পারে না সরকার। বিবৃতিতে অভিযোগ করা হয়, কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সরকার সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হত্যা ও নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে। ‘তিন শতাধিক’ ছাত্র-জনতাকে হত্যা করার অভিযোগ করা হয় তাদের বিবৃতিতে।

এছাড়া বিবৃতিতে বলা হয়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রথম সারির কয়েকজন সমন্বয়ককে পুলিশি হেফাজতে নিয়ে মনগড়া বক্তব্য আদায়ের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে সরকার। সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামের ওপর ব্যাপক নির্যাতন চালানো হয়েছে। এছাড়া সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ, আবু বাকের মজুমদারসহ কয়েকজনের সন্ধান দাবি করা হয়।

২২ জুলাই, সোমবার

এদিন কোটা সংস্কার করে আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী তৈরি করা প্রজ্ঞাপনে অনুমোদন দেন প্রধানমন্ত্রী।

সংঘর্ষে সারা দেশের আরও ১৩ জন নিহতের খবর পাওয়া যায় সোমবার। তাদের মধ্যে পাঁচজন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। নারায়ণগঞ্জে তিনজন মারা যান শনিবার, যাদের লাশ উদ্ধার করা হয় সোমবার। এর বাইরে একজন পুলিশ সদস্যের মৃত্যুর তথ্য জানা যায় এদিন।

২৩ জুলাই, মঙ্গলবার

কোটাপ্রথা সংস্কার করে প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার।

মঙ্গলবার পর্যন্ত ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় সংঘর্ষে মোট ১৯৭ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে কয়েকটি পত্রিকা। মৃত্যুর এই হিসাব বিভিন্ন হাসপাতাল সূত্র এবং মরদেহ নিয়ে আসা ব্যক্তি ও স্বজনদের সূত্রে পাওয়া। সব হাসপাতালের চিত্র এখনো পাওয়া যায়নি।

সর্বশেষ মঙ্গলবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ছাত্র হৃদয় চন্দ্র তরুয়া (২২)। তিনি গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামে গুলিবিদ্ধ হন।

মঙ্গলবার নতুন করে জানা যায় আরও আটটি মৃত্যুর তথ্য। এর মধ্যে ঢাকার ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হাসপাতালে পাঁচজন এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দুজনের মৃত্যু হয়। সাভারে এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যু হয় আরেক ব্যক্তির।

সোমবার ও মঙ্গলবার সারা দেশে ব্যাপক ধরপাকড় চালায় পুলিশ। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয় ঢাকাসহ সারাদেশে কয়েক সহস্রাধিক ব্যক্তিকে আটক ও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এদের বড় অংশই বিএনপি, জামায়াত শিবির ও ছাত্রদলের নেতাকর্মী। এরা সবাই নাশকতা ও সহিংসতায় জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ করছে পুলিশ।

ফুটেজ দেখে সেতু ভবনে আগুন-লুটপাটে জড়িতদের ধরা হচ্ছে : ডিবি

কোটা সংস্কার আন্দোলনের নামে ঢাকা মহানগরীতে সরকারি স্থাপনায় ভাঙচুর, সহিংসতা ও নাশকতামূলক কর্মকা- হয়েছে। এসব ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ।

তিনি বলেন, আমাদের হাতে আসা সিসিটিভি ফুটেজে কে কীভাবে আগুন লাগায় এবং মালামাল লুট করে নিয়ে যায়। এই ঘটনায় জড়িত অনেকের নামপরিচয় পাওয়া গেছে। সবাইকে গ্রেপ্তার করা হবে। মহাখালী সেতু ভবনে ঢুকে লুটপাটকারী দুইজনকে গ্রেপ্তারসহ ভাঙচুর চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়ার ঘটনায় মোট ৯ জনকে গ্রেপ্তারের পর একথা বলেন তিনি। গ্রেপ্তার দুই মালামাল লুটপাটকারী হলেন, জজ মিয়া, মো. রাকিব (২২)। ২৩ জুলাই মঙ্গলবার রাতে মহাখালী থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

বুধবার (২৪ জুলাই) হারুন অর রশীদ নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, আন্দোলনের নামে ঢাকা শহরে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ এবং লুটপাট করা হয়েছে। মনোবল ভেঙে দেয়ার জন্য পুলিশকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা ও আহত করেছে। তথ্যপ্রযুক্তি ডাটা সেন্টারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা চালায়। হামলার রসদ সরবরাহ করার তথ্য-প্রমাণ আমাদের হাতে আছে।

মহাখালীর সেতু ভবনে জামায়াত-শিবির ও বিএনপির কিছু নেতা টাকা পয়সা দিয়ে সাততলা বস্তি এবং কুড়ি বস্তিসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন সংগ্রহ করেছে। এরপর মহাখালীতে জড়ো হয়ে ইটপাটকেল শুরু করে। পরবর্তী সময়ে তারা সেতু ভবনে ঢুকে ভাঙচুর চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং লুটপাট চালায়। আমাদের হাতে আসা সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, তারা কীভাবে আগুন লাগায় এবং মালামাল লুট করে নিয়ে যায়। এই ঘটনায় জড়িত অনেকের নামপরিচয় পেয়েছি। হারুন বলেন, গ্রেপ্তার দুজনের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৭ বিএনপি ও জামায়াত নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

তারা হলেন, ঢাকা উত্তর যুবদলের সাবেক সভাপতি এস এম জাহাঙ্গীর, বিএনপি নেতা বরকতুল্লা বুলুর ছেলে সানিয়াত বুলু, মহানগর দক্ষিণ বিএনপিসহ সভাপতি মোশারফ হোসেন খোকন ওরফে কাইল্লা খোকন, কৃষক দলের সহ-সভাপতি নাসির উদ্দিন, ছাত্রদলের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মিজানুর রহমান দয়াল, জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা এস এম কামাল উদ্দিন ও ভাটারা থানার আমির রেজাউল করিম।

জামায়াত-বিএনপি সরকারি স্থাপনাকে কেনো টার্গেট করছে জানতে চাইলে হারুন বলেন, ঢাকা বিশ্বববিদ্যালয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলন চলছে। পুলিশকে হত্যা, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, ডাটা সেন্টার, বিটিভি, আমাদের মেট্রোরেলে হামলা করেছে। সব জায়গায় গান পাউডার দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছে। তারা ৭১ সালের মতো পুরোনো দিনে ফিরে গেছে। তারা চেয়েছিল সরকার উৎখাত করতে। দেশে কোটা আন্দোলন চলছে আর তারা ঢাকার বর্ডার এলাকায় রেখে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করার চেষ্টা করেছে। আমরা সবার নামপরিচয় পেয়েছি। তারা কীভাবে কার মাধ্যমে গান পাউডার ও অস্ত্র এনেছে বের করা হবে। তারা পুলিশ মারার জন্য টাকা ও আগুন দেয়ার জন্য টাকা দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। কে নির্দেশনা দিয়েছে, কারা অর্থায়ন করেছে সব বের করা হবে বলেও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন হারুন।

অবিলম্বে হত্যা ও হামলাকারীদের আইনের আওতায় আনতে হবে: ফখরুল

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে সহিংসতায় বিএনপিকে দায় দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা ভিত্তিহীন ও কাল্পনিক।’

মঙ্গলবার (২৩ জুলাই) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে মির্জা ফখরুল এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘হত্যা ও হামলাকারীদের অবিলম্বে আইনের আওতায় আনতে হবে। আওয়ামী সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের হামলা, ভাঙচুর, নেতৃবৃন্দসহ সাধারণ মানুষকে গ্রেফতার ও কারান্তরীণের ঘটনায় প্রমাণিত হয়েছে যে, সরকারের ভিতে কম্পন শুরু হয়েছে।’

এর আগে গত সোমবার (২২ জুলাই) ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে দেওয়া বক্তব্যে গত কয়েকদিনে সারা দেশে যে তাণ্ডব চলেছে, তার জন্য বিএনপি-জামায়াতকে দায়ী করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ।

তিনি বলেন, ‘দ্রুত এই দুর্বৃত্ত শিবির-জামায়াত, বিএনপির সন্ত্রাসী, এদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। ১৩/১৪-তে অগ্নিসন্ত্রাস যারা করেছে, তাদের অনেককে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে আবার একই চেহারায়। তবে এবার অত সহজে ছাড়া হবে না।’

প্রসঙ্গত, ইতোমধ্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ দলটির ডজনখানেকের বেশি কেন্দ্রীয় নেতা, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক, ১২ দলীয় জোটের সৈয়দ এহসানুল হুদাসহ অনেকে গ্রেফতার হয়েছেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র জানায়, সংশ্লিষ্টতা না পাওয়া গেলে রাজনৈতিক নেতাদের কাউকে-কাউকে ছেড়ে দেওয়া হতে পারে।

বিবৃতিতে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘গতকাল (সোমাবার, ২২ জুলাই) প্রধানমন্ত্রী বিএনপিকে উদ্দেশ করে যে বক্তব্য রেখেছেন, তা সম্পূর্ণ রূপে ভিত্তিহীন, কাল্পনিক এবং বিএনপির আদর্শের প্রতি কুঠারাঘাতের শামিল। আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাই।’

বিএনপি মহাসচিব আরও বলেন, ‘দেশব্যাপী সংঘটিত সরকারি অপতৎরতা এবং পৈশাচিক ও বর্বরোচিত ঘটনা সারা বিশ্ব থেকে আড়াল করতে পরিকল্পিতভাবে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তান আমল এবং স্বৈরাচার এরশাদ আমলেও এমন নির্বিচার হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়নি।’

‘শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়ে প্রশাসনের কর্মকর্তারা যে ধরনের বক্তব্য রাখছেন, তাতে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, তারা সরকারি দলের কোনও পদে অধিষ্ঠিত আছেন। আন্দোলনকে দমন করতে আওয়ামী সরকারের এই ধরনের আগ্রাসী ও নির্মম ভূমিকার নজির পৃথিবীতে নেই।’

বিবৃতিতে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের নয়া পল্টনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুরের নিন্দা ও অবিলম্বে হামলাকারীদের গ্রেফতারের দাবি জানান বিএনপি মহাসচিব।

এদিকে আজ বুধবার (২৪ জুলাই) বিকালে সংবাদ সম্মেলন করবেন বিএনপির মহাসচিব।

 

জনমনে স্বস্তি না ফেরা পর্যন্ত কারফিউ চলবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জানিয়েছেন, জনমনে স্বস্তি না ফেরা পর্যন্ত কারফিউ চলবে। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আপনারাই যখন বলবেন, আমরা স্বস্তি অনুভব করছি, তখনই কারফিউ প্রত্যাহার করা হবে।’

সম্প্রতি কোটা আন্দোলন চলাকালে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিহত তিন পুলিশ সদস্য ও এক আনসার সদস্যের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাতের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন। নিহতদের প্রত্যেক পরিবারকে এ সময় সরকারের পক্ষ থেকে ২ লাখ টাকা নগদ ও ৮ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র এবং বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষ থেকে ৫ লাখ টাকার চেক হস্তান্তর করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিহতদের স্বজনদের উদ্দেশ করে বলেন, ‘আপনারা কখনও একা অনুভব করবেন না। আপনাদের পাশে সরকার আছে, দেশ আছে। আপনাদের যে কোনো সহযোগিতার জন্য সরকার প্রস্তুত আছে। আমি শিগগিরই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও আপনাদের সাক্ষাৎ করিয়ে দেওয়ার  চেষ্টা করবো।‘

কোটা সংস্কার আন্দোলনে শিক্ষার্থী কিংবা সাধারণ জনগণ কতজন মারা গেছেন জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘জনসাধারণ কতজন মারা গেছেন, তার কোনো হিসাব আমাদের কাছে নেই। কোনো থানায় এ সংক্রান্ত কোনো মামলাও দায়ের হয়নি। পুলিশ তথ্য সংগ্রহ করছে, এ বিষয়ে পরে বলা যাবে।’

কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতারা অভিযোগ করেছেন, তাদের কয়েকজনকে পাওয়া যাচ্ছে না। এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এ ধরনের কোনো তথ্য আমাদের কাছে নাই। তাদের পরিবার থেকেও আমাদের কাছে কোনো অভিযোগ করেনি। তারা অভিযোগ করলে আমরা আপনাদের জানাতে পারবো।’

এরইমধ্যে আন্দোলনে সহিংসতার ঘটনায় বেশ কিছু মামলা দায়ের হয়েছে। এই মামলাগুলো দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে যাবে কিনা, জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আগে চার্জশিট দায়ের হোক। মামলার মেরিট দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ছাত্রদের কোটা আন্দোলন একটা সহিংস আন্দোলনে পরিণত হয়েছিল। আমাদের পুলিশ, বিজিবি, আনসারসহ সব বাহিনী ধৈর্যের সঙ্গে এ আন্দোলন মোকাবিলা করেছে। এ আন্দোলনে আমরা বর্বরতা দেখেছি।

তিনি বলেন, আমরা অপরাধীদের একে একে চিহ্নিত করবো। পরিস্থিতি সামাল দিতে বাধ্য হয়েই কারফিউ দিয়েছি। এই জঙ্গি উত্থান ও সন্ত্রাসীদের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছি। আগামী ৩ থেকে ৪ দিনের মধ্যে সবকিছু নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে বলে আশা করছি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আন্দোলনের নামে কারা পেছন থেকে মদদ দিয়েছে আপনারা সেটা জানেন। এটা সেই স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি। বাংলাদেশকে একটা অকার্যকর দেশে পরিণত করার জন্য যারা ইন্ধন দিয়েছে তারা ছাত্রদের বাদ দিয়ে নিজেরাই সামনে নেমে এসেছিল।

আন্দোলনকারীদের সবগুলো দাবি মেনে নেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা দেখেছি পুলিশকে টার্গেট করে তারা হামলা চালিয়েছে। পুলিশ সদস্যকে মেরে ফাঁসি দিয়ে গাছে টানিয়ে রেখেছে। এ চিত্র আপনারা দেখেছেন। আপনারা দেখেছেন, বাংলা ভাই যে জঙ্গিবাদের উত্থান করেছিল, এই জামায়াত-বিএনপিও একই কাজ করেছে।

 

উত্তরায় কোটা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে নিহত ৪

রাজধানীর উত্তরা-আজমপুর এলাকায় কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে চার জন নিহত হয়েছেন।

নিহতের মধ্যে একজনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। তিনি হলেন আইইউবিএটির (ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজি) শিক্ষার্থী মোহাম্মদ তানভীর (২৫)। তাঁর বাবার নাম সামসুজ্জামান এবং মায়ের নাম বীথি আক্তার।

তানভীরের খালা নার্গিস বলেন , ‘আমাদের ছেলের লাশ রাজউক কলেজে আছে। আমরা সেখানে যাচ্ছি।’

আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘তোমরা চলে যাও। আমরা চাই না আর কোনো মায়ের বুক খালি হোক।’

উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিজানুর রহমান  বলেন, ‘আমাদের এখানে একজন মারা গেছে। ৫০-৬০ জন চিকিৎসা নিয়েছে। এর মধ্যে চারজনের অবস্থা গুরুতর।’

এ বিষয়ে কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন হুমায়ুন কবির (শয্যা নম্বর-৫০৩) এক ব্যক্তি  বলেন, ‘হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চারজনের লাশ দেখতে পেয়েছি। আরও অনেকে আহত অবস্থায় আছে।’

উত্তরার এই দুই হাসপাতালের কোনোটিতেই সাংবাদিকদের প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না।

রামপুরা-বাড্ডায় একজন নিহত, কাঁদানে গ্যাস-রাবার বুলেটে আহত অর্ধশতাধিক

রাজধানীর রামপুরা-বাড্ডা এলাকায় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে একজন গাড়িচালক নিহত হয়েছেন। সংঘর্ষের সময় তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। এদিকে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষসহ কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট ও ছররা গুলিতে আহত হয়েছেন অন্তত অর্ধশতাধিক আন্দোলনকারী।

তাঁদের উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। কাউকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও পাঠানো হয়েছে।

নিহত ব্যক্তির নাম দুলাল মাতবর। তিনি হাইচ গাড়ির চালক। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে বনশ্রী ফরাজী হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে তাঁর মৃত্যু হয়।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, সড়ক অবরোধ করে তাঁরা শাটডাউন পালন করছিলেন। পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও গুলি (রাবার বুলেট) চালিয়ে আক্রমণ করেছে। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত (১টা ৪৭ মিনিট) পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের দফায় দফায় সংঘর্ষ চলছিল।

আজ বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টায় সরেজমিন দেখা যায়, রামপুরা থেকে বাড্ডা পর্যন্ত পুরো সড়ক রয়েছে শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের দখলে। বাঁশ, লোহার রড নিয়ে সড়কের বিভিন্ন স্থানে অবস্থা নিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। তাঁদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন আশপাশের বিভিন্ন শ্রমজীবী মানুষ।

এদিকে পুলিশ অবস্থান নিয়েছে বাড্ডা হাতিরঝিল সংযোগ সড়কে। সেখান থেকে মাঝেমধ্যে বের হয়ে এসে টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট ছুড়ছে। আর শিক্ষার্থীদের একটি দল ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে, একটি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের উল্টা পাশের গলিতে অবস্থান নিয়সকাল সাড়ে ১০টা থেকেই রামপুরা-বাড্ডা এলাকায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বেলা ১১টার দিকে পুলিশের সঙ্গে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ হলে পুলিশ পিছু হটে। পরে কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকে যায় পুলিশ। বাইরে অবস্থান নেন আন্দোলনকারীরা।

সেখানে বেশ কয়েকটি দোকানপাট, স্থাপনায় ভাঙচুর চালানো হয়। পরবর্তীকালে আরও অনেক শিক্ষার্থী এসে সড়কে অবস্থান নেন। রামপুরা ব্রিজে একটি দল পুলিশ বক্সে আগুন ধরিয়ে দেয়। দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে পুলিশ সড়কে অবস্থান নেওয়া আন্দোলনকারীদের দিকে রাবার বুলেট ও ছররা গুলি ছোড়ে। এ সময় শিক্ষার্থীসহ অনেকে আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়।

আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনায় দুই মন্ত্রীকে দায়িত্ব দিলেন প্রধানমন্ত্রী

কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনায় বসছে সরকার। এই আলোচনার জন্য দুই মন্ত্রীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা যখনই আলোচনায় বসতে রাজি হবেন তখন এ আলোচনা হবে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। বৃহস্পতিবার দুপুরে সংসদ ভবনের টানেলে ব্রিফিংয়ে আইনমন্ত্রী এ তথ্য জানিয়েছেন।

তিনি জানান, তাকে এবং শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরীকে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনার জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলাকালে গত মঙ্গলবার দেশের বিভিন্ন জায়গায় সংঘর্ষে ৬ জন নিহত হয়েছেন। এ ব্যাপারে হাইকোর্টের বিচারপতি খন্দকার দিলীরুজ্জামানকে দিয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী।

শিক্ষার্থীরা যখনই রাজি হবেন তখনই এ আলোচনা শুরু হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।